অক্ষয় তৃতীয়া হল চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথি। অক্ষয় শব্দের অর্থ হল যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না। এই পবিত্র তিথিতে কোনো শুভকার্য সম্পন্ন করলে তা অনন্তকাল অক্ষয় হয়ে থাকে।

অক্ষয় তৃতীয়ার তাৎপর্যঃ

১. এই শুভদিনে বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার (শ্রীমদ্ভাগবত অনুযায়ী ভগবানের ষোড়শ অবতার) পরশুরাম আবির্ভূত হয়েছিলেন।
২. মহর্ষি বেদব্যাস ও গণেশ এই দিনে মহাভারত রচনা আরম্ভ করেছিলেন।
৩. এই দিনে রাজা ভগীরথ গঙ্গা দেবীকে মর্ত্যে নিয়ে এসেছিলেন।
৪. এইদিনে সত্যযুগ শেষ হয়ে ত্রেতাযুগের সূচনা ঘটে। ঋষিগণ, ভক্তগণ এই দিনটির স্মরণে যজ্ঞের আয়োজন করেন এবং যজ্ঞের প্রধান উপকরণ হিসেবে বার্লি রাখা হয়।
৫. এই দিনই ভক্তরাজ সুদামা শ্রীকৃষ্ণের সাথে দ্বারকায় গিয়ে দেখা করেন এবং তাঁর থেকে সামান্য চালভাজা নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সকল দুঃখ মোচন করেন।
৬. এদিন থেকেই পুরীধামে শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উপলক্ষ্যে রথ নির্মাণকাজ শুরু হয়।
৭. এদিন দেবী অন্নপূর্ণার আবির্ভাব ঘটে।
৮. এদিনই দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে যান এবং শরণাগতের পরিত্রাতা হিসেবে সখী কৃষ্ণাকে রক্ষা করেন শ্রীকৃষ্ণ।
৯. এদিন কুবেরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে অতুল ঐশ্বর্য প্রদান করেন।
১০. কেদার বদরী গঙ্গোত্রী যমুনত্রীর যে মন্দির ছয়মাস বন্ধ থাকে এই দিনেই তার দ্বার উদ্ঘাটন করা হয়। দ্বার খুললেই দেখা যায় সেই অক্ষয়দ্বীপ যা ছয়মাস আগে জ্বালিয়ে রাখা হয়েছিল।

চন্দন যাত্রাঃ
চন্দন যাত্রা চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে শুরু হয়ে ২১ দিন পর্যন্ত চলে। ভগবান শ্রীজগন্নাথদেব এই দিনে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে চন্দনযাত্রা মহোৎসবটি পালন করার জন্য সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। ভগবানের অঙ্গলেপন এক ধরণের ভক্তিমূলক কর্ম এবং চন্দন হল সর্বশ্রেষ্ঠ প্রলেপন। যেহেতু ভারতে বৈশাখ মাস অত্যন্ত উষ্ণ থাকে, তাই চন্দনের শীতল গুণ ভগবানের আনন্দ প্রদান করে। জগন্নাথের দুই চক্ষু ব্যতীত সর্বাঙ্গে চন্দন লেপন করা হয়ে থাকে। এবং উৎসব-মূর্তি বা বিগ্রহগণকে নিয়ে শোভাযাত্রা করা হয় এবং মন্দির পুষ্করিণীতে নৌকাবিহার করা হয়ে থাকে।

অক্ষয় তৃতীয়াতে বিশ্বের ইসকন মন্দিরসহ বৃন্দাবনের সমস্ত বড় গোস্বামী মন্দিরের বিগ্রহ চন্দনে লেপন করা হয়ে থাকে।
মহাভারতে উল্লেখিত, পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসের সময় বিরাট রাজার প্রাসাদে ছদ্মবেশে থাকতেন। ভীম কর্তৃক কিচক নিধনের পর বিরাট রাজা অনুধাবণ করতে পেরেছিলেন যে, তাঁর প্রাসাদে পাণ্ডবরা থাকছেন। বিরাট রাজা তাঁদের প্রতি অনেক গর্ববোধ করলেন এবং মিত্রতার সম্পর্ক স্থাপন করলেন। যুধিষ্ঠির তখন তপ্ত গ্রীষ্মে শ্রীকৃষ্ণের পরিতৃপ্তির জন্য নৌকাভ্রমণের আয়োজন করতে বিরাট রাজাকে উপদেশ করলেন।

গ্রীষ্মের তাপে ভগবানের প্রীতিবিধানার্থে, ভগবানের শরীর সুবাসিত করার লক্ষ্যে বিরাট রাজা সুগন্ধি জলে চন্দন বাটা মিশিয়ে সবকিছুর আয়োজন করলেন। বিরাট রাজার ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে ভগবান তাঁর অগ্রজ ভ্রাতা বলরামকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। কৃষ্ণ, বলরাম এবং পঞ্চপাণ্ডব স্নানযাত্রা এবং বিহার উৎসব উপভোগ করলেন এবং বিরাট রাজা তাঁর ভক্তিমূলক বাসনা পরিপূর্ণ করলেন। পরে এ ঘটনাটির স্মরণে ভগবান পঞ্চপাণ্ডবদের নিয়ে নরেন্দ্র সরোবরে চন্দন যাত্রার আয়োজন করেন।

মাধবেন্দ্রপুরী, যিনি ছিলেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একজন মহান ভক্ত, তিনি যখন বৃন্দাবনে ছিলেন, একদিন স্বপ্নে গোপালকে জঙ্গলে দেখতে পেলেন, গোপাল তাঁকে বলছেন, “মাধব, আমি জঙ্গলে মাটির নিচে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আছি। দয়া করে আমার স্থানটি খুঁড়ে আমাকে এখান থেকে উদ্ধার করে মন্দিরে স্থাপন কর।” তখন মাধবেন্দ্রপুরী গ্রামবাসীদের সহযোগিতায় ঐ স্থানটি খুঁড়ে গোপালের বিগ্রহ দেখতে পেলেন এবং তা গোবর্ধন পর্বতের চূড়ায় স্থাপন করলেন।
একদিন গোপাল মাধবকে বলছেন, “আমি অনেকদিন ধরে মাটির নিচে ছিলাম, তাই আমার শরীর জ্বালাপোড়া করছে। তুমি কি জগন্নাথপুরী থেকে কিছু চন্দনকাঠ এনে আমার শরীরে লেপন করে দেবে?”
মাধবেন্দ্রপুরী তখন বৃদ্ধ ছিলেন, কিন্তু তিনি গোপালের আদেশ অমান্য করতে পারেননি। তিনি জগন্নাথপুরীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। তিনি যখন রেমুণায় পৌঁছলেন, যেখানে উড়িষ্যা ও বাংলার সীমান্তে গোপীনাথের মন্দির রয়েছে, তিনি সেখানে সারারাত ছিলেন এবং দেখলেন, পূজারী ১২টি পাত্রে গোপীনাথকে ক্ষীর অর্পণ করেছিলেন। তখন মাধবেন্দ্রপুরী ভাবলেন, “আমি যদি এক কণা ক্ষীরের স্বাদ নিতে পারতাম, তাহলে আমিও বৃন্দাবনে আমার গোপালের জন্য তৈরি করতে পারতাম। ইতোমধ্যেই, তাঁর চেতনা তাঁকে ধিক্কার দিল, ওঃ আমি কত বোকা! ভগবান ভোগ গ্রহণের পূর্বেই আমি তা খাওয়ার চিন্তা করছি।” ভুল বুঝতে পেরে তিনি শীঘ্রই মন্দির ত্যাগ করে বাইরে একটি গাছের নিচে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করে রজনী অতিবাহিত করতে লাগলেন।

অধিক রাতে, গোপীনাথ বিগ্রহ পূজারীর সম্মুখে স্বপ্নে আবির্ভূত হলেন এবং বলতে লাগলেন, “আমি আমার আঁচলের নিচে এক পাত্র ক্ষীর লুকিয়ে রেখেছি। তুমি সেটি নিয়ে মন্দিরের বাইরে বৃক্ষতলে অবস্থানরত মাধবেন্দ্রপুরীকে দাও।” পূজারী যথারীতি তা করল এবং সবকিছু মাধবেন্দ্রপুরীকে খুলে বলল। এরপর, গোপীনাথ তাঁর ভক্তের প্রতি এহেন কাজ করেছিলেন বিধায় ক্ষীরচোরা গোপীনাথ রূপে খ্যাত হলেন।
পরদিন সকালে, মাধবেন্দ্রপুরী চন্দন কাঠ আনার উদ্দেশ্যে জগন্নাথপুরীর উদ্দেশ্যে পুনরায় যাত্রা শুরু করলেন। তিনি পুরী পৌঁছানোর পূর্বেই গোপীনাথের ক্ষীরচুরির সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। জগন্নাথপুরীতে, তিনি পূজারীর নিকট গোপালের অভিলাষ বিস্তারিতভাবে বললেন। পূজারী তাঁকে পুরীর রাজার নিকটে নিয়ে গেলেন। তাঁর কথা শুনে রাজা তাঁকে এক মণ (প্রায় ৩৭ কেজি) বিশেষ চন্দন দিলেন, এবং দুইজন নিরাপত্তাকর্মীকে বললেন মাধবের যেন কোনোরূপ সমস্যায় পড়তে না হয়।

ফেরার পথে, যখন তিনি গোপীনাথ মন্দিরের নিকটে পৌঁছলেন, তখন গোপাল স্বপ্নাদেশে তাঁকে বললেন, “মাধব, তুমি গোপীনাথের শরীরেই চন্দন লেপন কর, এবং আমিও তা গ্রহণ করব, যেহেতু গোপীনাথ আর আমি একই।” মাধবেন্দ্রপুরী তখন সকল গ্রামবাসীদের সাথে নিয়ে গোপীনাথের শরীরে চন্দন লেপন করলেন। এরপর থেকে ঐ ঘটনা স্মরণে চন্দন যাত্রা মহোৎসব পালন করা হয়ে থাকে।

Advertisements