“ত্রিতাপ দুঃখ নিরাময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের  উদ্দেশ্যে  সমস্ত কর্ম সমর্পণ করা।” (শ্রীমদ্ভাগবত, ১.৫.৩২)

সব রকমের দুঃখ উপশম করার বা ভববন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার সব চাইতে ব্যবহারিক এবং সব চাইতে সরল পন্থা হচ্ছে প্রামাণিক এবং নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত কার্যকলাপের বর্ণনা বিনীতভাবে শ্রবণ করা। সেটিই হচ্ছে একমাত্র ঔষধ।

krishnafrance.jpg

জড় জগতের অস্তিত্ব অত্যন্ত দুঃখময়। মূর্খ মানুষেরা তাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে আধি-আত্মিক, আধিদৈবিক এবং আধিভৌতিক – এই ত্রিতাপ দুঃখ থেকে মুক্ত হওয়ার নানা রকম উপায় উদ্ভাবন করেছে। সমস্ত পৃথিবী এই ত্রিতাপ দুঃখ থেকে মুক্ত হওয়র জন্য নানাভাবে সংগ্রাম করছে, কিন্তু মানুষ জানে না যে, ভগবানের অনুমোদন ছাড়া কোনো পরিকল্পনা অথবা প্রচেষ্টা তাদের এই ত্রিতাপ দুঃখ থেকে মুক্ত করতে পারে না এবং তাদের বহু আকাঙ্ক্ষিত শান্তি দান করতে পারে না। ওষুধ দিয়ে রোগীর রোগ নিরাময়ের চেষ্টা অর্থহীন, যদি তা ভগবানের দ্বারা অনুমোদিত না হয়।

নৌকা যতই মজবুত বা উপযুক্ত হোক না কেন, ভগবানের অনুমোদন না থাকলে তাতে চড়ে নদী বা সমুদ্র পার হওয়া যায় না। আমাদের জানতে হবে যে পরম অনুমোদন কর্তা হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান, এবং তাই আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টার চরম সাফল্যের জন্য অথবা সাফল্যের পথে সমস্ত প্রতিবন্ধকগুলি দূর করার জন্য আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টাগুলি ভগবানের করুণার কাছে সমর্পণ করতে হবে।

ভগবান সর্বব্যাপ্ত, সর্বশক্তিমান এবং সর্বজ্ঞ – সব রকমের সৎ এবং অসৎ কার্যের তিনিই হচ্ছেন পরম অনুমোদনকারী। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ভগবানের করুণার উদ্দেশ্যে আমাদের সমস্ত কার্যকলাপ সমর্পণ করা এবং নির্বিশেষ ব্রহ্ম, পরমাত্মা অথবা পরমেশ্বর ভগবানরূপে তাঁকে মেনে নেওয়া।

জাতি, ধর্ম এবং বৃত্তি নির্বিশেষে সকলেরই কর্তব্য হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের সেবার উদ্দেশ্যে সব কিছু নিবেদন করা। কেউ যদি বিদগ্ধ পণ্ডিত হন, বৈজ্ঞানিক হন, দার্শনিক হন বা কবি হন – তাঁদের সকলেরই কর্তব্য হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের পরমেশ্বরত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁদের জ্ঞানের সদ্ব্যবহার করা। তাঁদের কর্তব্য হচ্ছে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভগবানের শক্তিকে বুঝবার চেষ্টা করা। তাঁকে অস্বীকার করে তাঁর মতো হওয়ার চেষ্টা করা অথবা একটু জ্ঞান অর্জন করে তাঁর সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করা কখনই উচিত নয়।

কেউ যদি পরিচালক হন, রাজপুরুষ হন, যোদ্ধা হন, রাজনীতিবিদ হন – তা হলে তাঁদের কর্তব্য হচ্ছে তাঁর উপযুক্ত যোগ্যতা দিয়ে ভগবানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা। অর্জুন যেভাবে ভগবানের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন, সেইভাবেই ভগবানের জন্য যুদ্ধ করতে হবে। প্রথমে কিন্তু মহাবীর অর্জুন যুদ্ধ করতে চাননি, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁকে বোঝালেন যে যুদ্ধ করা অত্যন্ত প্রয়োজন, তখন শ্রীঅর্জুন তাঁর মত পরিবর্তন করে ভগবানের জন্য যুদ্ধ করেছিলেন।

তেমনই, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, কৃষক – যে যে বৃত্তিতেই নিযুক্ত থাকুক না কেন, তাঁদের কর্তব্য হচ্ছে তাঁদের কষ্টার্জিত ধন ভগবানের উদ্দেশ্যে ব্যয় করা। তাদের সর্বদাই মনে করা কর্তব্য যে, যে অর্থ তিনি সংগ্রহ করেছেন তা ভগবানের সম্পদ। ঐশ্বর্যকে সৌভাগ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী লক্ষ্মীদেবী বলে মনে করা হয়, আর ভগবান হচ্ছেন নারায়ণ বা শ্রীমতি লক্ষ্মীদেবীর পতি। লক্ষ্মীদেবীকে নারায়ণের সেবায় যুক্ত করে সুখী হওয়ার চেষ্টা করাটাই সমীচীন। এইভাবেই ভগবানকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে উপলব্ধি করতে পারা যায়।

সকলেরই জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ কর্তব্য হচ্ছে, পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাবিলাসের কাহিনী শ্রবণ করে সব রকমের জড় কার্যকলাপ থেকে মুক্ত হওয়া। কিন্তু সে রকম সুযোগ না পাওয়া গেলে, যেই -যেই বস্তুর প্রতি বিশেষ আসক্তি রয়েছে সেগুলি ভগবানের সেবায় নিযুক্ত করতে চেষ্টা করা উচিত, এবং সেটিই হচ্ছে যথার্থ শান্তি এবং সমৃদ্ধি লাভের উপায়।

হরে কৃষ্ণ!

Advertisements