সর্বত্রই বিভিন্ন রকম প্রচেষ্টার মাধ্যমে মানুষ যত বেশি সম্ভব ইন্দ্রিয়-সুখ উপভোগ করার চেষ্টা করে। কোন কোন মানুষ ব্যবসা করে, চাকরি করে, অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করে, রাজনৈতিক পদ লাভ করে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করার চেষ্টা করছে। আর কেউ পুণ্য কর্ম করে পরবর্তী জীবনে উচ্চতর লোকে গিয়ে সুখভোগ করার চেষ্টা করছে।

“যে মানুষ যথার্থই বুদ্ধিমান এবং পারমার্থিক বিষয়ে উৎসাহী, তাদের কর্তব্য হচ্ছে সেই চরম লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য প্রয়াস করা, যা এই ব্রহ্মাণ্ডের সর্বোচ্চ লোক (ব্রহ্মলোক) থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন লোক (পাতাল লোক) পর্যন্ত ভ্রমণ করেও লাভ করা যায় না। ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে লব্ধ যে জড় সুখ, তা কালের প্রভাবে আপনা থেকেই লাভ হয়, ঠিক যেমন আকাঙ্ক্ষা না করলেও কালক্রমে আমরা দুঃখভোগ করে থাকি।” (শ্রীমদ্ভাগবত, ১.৫.১৮)

15697375_1876618749239391_6597936466996218188_n.jpg

শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, চন্দ্রলোকের অধিবাসীরা সোমরস পান করে কল্পনাতীত সুখ উপভোগ করেন, আর অনেক দান করার ফলে পিতৃলোকে উন্নীত হওয়া যায়। এইভাবে এই জীবনে অথবা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের বিভিন্ন উপায় রয়েছে। পুণ্য কর্ম করার ফলে মানুষ উচ্চতর লোকে উন্নীত হতে পারে, কিন্তু আজকাল কিছু মানুষ এই রকম পুণ্য কর্ম না করেই যান্ত্রিক উপায়ে চন্দ্র আদি উচ্চতর লোকে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব, কিন্তু সেটা কখনই সম্ভব হবে না।

পরমেশ্বর ভগবানের আইন অনুসারে জীব তার পূর্বকৃত কর্মের ফলস্বরূপ বিভিন্ন স্থানে অধিষ্ঠিত হয়। শাস্ত্র নির্দেশিত সৎ কর্মের প্রভাবেই কেবল উচ্চ কুলে জন্ম হয়, ঐশ্বর্য লাভ হয়, দৈহিক সৌন্দর্য লাভ হয়। এই জীবনেও কেউ যখন ভাল কাজ করে, তখন সে উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত হয় অথবা ধনসম্পদ লাভ করে। তেমনই, আমরা আমাদের সৎ কর্মের প্রভাবে পরবর্তী জীবনে এই ধরণের আকাঙ্ক্ষিত অবস্থা পাভ করতে পারি। তা না হলে, একই স্থানে একই সময়ে জন্মগ্রহণ করে দু’জন মানুষ ভিন্ন অবস্থা প্রাপ্ত হত না। কিন্তু এই সমস্ত জাগতিক স্থিতি অনিত্য। সর্বোচ্চ স্তরের ব্রহ্মলোকের স্থিতি অথবা সর্বনিম্ন স্তরের পাতাল লোকের স্থিতি আমাদের কর্ম অনুসারে পরিবর্তন হয়। দার্শনিক মনোভাবাপন্ন মানুষদের কখনই এই ধরণের অনিত্য স্থিতির দ্বারা প্রলোভিত হওয়া উচিৎ নয়। তাঁদের কর্তব্য হচ্ছে পূর্ণ জ্ঞান এবং নিত্য আনন্দময় ভগবদ্ধামে নিত্য জীবন লাভ করা, যেখান থেকে এই দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্ত জড় জগতে আর ফিরে আসতে হবে না। দুঃখ এবং মিশ্র সুখ হচ্ছে জড় জীবনের দুটি বৈশিষ্ট্য এবং তা ব্রহ্মলোক ও অন্য সমস্ত লোকে একইভাবে লাভ হয়। স্বর্গের দেবতাদেরও তা লাভ হয়, আবার কুকুর-শূকরদের জীবনেও তা লাভ হয়। দুঃখ এবং মিশ্র সুখ কেবল অনুভূতির পার্থক্য মাত্র, কিন্তু কেউই এই জড় জগতে জন্ম, মৃত্যু, জরা এবার ব্যাধির নিত্য দুঃখ থেকে মুক্ত নয়।

তেমনই, সকলের আবার বরাদ্দ অনুসারে সুখও লাভ হয়ে থাকে। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বেশি বা কম সুখ লাভ করা যায় না। তা লাভ হলেও আবার চলে যায়। তাই এই অনিত্য বস্তু লাভের জন্য সময়ের অপচয় করা উচিৎ নয়, কেবলমাত্র ভগবানের কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। সেইটিই প্রতিটি মানুষের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
হরে কৃষ্ণ!

Advertisements