সমস্ত জ্ঞানের বীজ বা বেদ, সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য নয়। শাস্ত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কারোর বেদ পাঠ করার চেষ্টা করা উচিত নয়। বিভিন্নভাবে এই নির্দেশটির ভুল অর্থ করা হয়েছে। এক শ্রেণীর মানুষ যারা কেবল ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করার ফলে নিজেদের ব্রাহ্মণ বলে জাহির করতে চায়, তারা দাবি করে যে, বেদ কেবল জাত-ব্রাহ্মণদেরই সম্পত্তি। আরেক শ্রেণীর লোক এই নির্দেশটিকে ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেনি যে সমস্ত মানুষ, তাদের প্রতি অন্যায় অবিচার বলে মনে করে। কিন্তু তারা উভয়েই ভ্রান্ত।

বেদ হচ্ছে এমন একটি বিষয়, যা ব্রহ্মাকে পর্যন্ত ভগবানের কাছ থেকে বুঝতে হয়েছিল; তাই এই জ্ঞান তাঁরাই হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন, যাঁরা সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত। রজ এবং তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত মানুষেরা কখনই বেদীর তত্ত্ব বুঝতে পারে না।

photo.jpg

বৈদিক জ্ঞানের চরম লক্ষ্য হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। সত্য যুগে সকলেই সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত ছিল। ত্রেতা ও দ্বাপর যুগে সত্ত্বগুণ ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে এবং সাধারণ মানুষ কলুষিত হয়ে পড়ে। বর্তমান কলিযুগে সত্ত্বগুণ প্রায় নেই বললেই চলে, তাই সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কৃপাময় মহর্ষি বেদব্যাস বেদকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেন যাতে রজ এবং তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা তা অনুসরণ করতে পারে।

স্ত্রী, শূদ্র এবং দ্বিজোচিত গুণাবলীবিহীন ব্রাহ্মণ কুলোদ্ভূত মানুষদের বেদের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষমতা নেই, তাই তাদের প্রতি কৃপাপরবশ হয়ে মহর্ষি বেদব্যাস মহাভারত নামক ইতিহাস রচনা করলেন, যাতে তারা তাদের জীবনের পরম উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পারে।  (শ্রীমদ্ভাগবত, ১.৪.২৫)

যে সমস্ত মানুষ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য অথবা আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে সংস্কৃতিসম্পন্ন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছে, অথচ যাদের মধ্যে তাদের পূর্বপুরুষদের সদ্গুণগুলি প্রকাশিত হয়নি, তাদের বলা হয় দ্বিজবন্ধু। যথযথ সংস্কার না থাকায় তাদের দ্বিজ বলে স্বীকার করা হয় না। বৈদিক সমাজে সংস্কারগুলি জন্মের পূর্ব থেকেই অনুষ্ঠিত হয়। মাতৃগর্ভে বীজ রোপণ করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় গর্ভাধান সংস্কার । এই গর্ভাধান সংস্কার বা পারমার্থিক পরিকল্পনা ব্যতীত যার জন্ম হয়েছে, তাকে যথার্থ দ্বিজ-পরিবারভুক্ত বলে গণনা করা হত না। গর্ভাধান সংস্কারের পর অন্য আরও সংস্কার রয়েছে যার একটি হচ্ছে উপনয়ন সংস্কার। এটি অনুষ্ঠিত হয় দীক্ষা গ্রহণের সময়। এই বিশেষ সংস্কারটির পর তাকে ‘দ্বিজ’ বলা হয়। প্রথম জন্ম হয় গর্ভাধান সংস্কারের সময়, এবং দ্বিতীয় বার জন্মটি হয় সদ্গুরুর কাছে দীক্ষা গ্রহণের সময়। যাঁরা এই মহান সংস্কারগুলির দ্বারা যথাযথভাবে সংস্কৃত হয়েছে, তাঁদেরই প্রকৃতপক্ষে দ্বিজ বলা হয়।

পিতামাতা যদি গর্ভাধান সংস্কাররূপ পারমার্থিক পরিবার-পরিকল্পনা না করে কেবল কামার্ত হয়ে সন্তান উৎপাদন করে, তা হলে তাদের সন্তানদের বলা হয় দ্বিজবন্ধু। এই দ্বিজবন্ধুরা যথাযথ সংস্কারের দ্বারা সংস্কৃত দ্বিজ পরিবারের সন্তানদের মত ততটা বুদ্ধিমান হয় না। দ্বিজবন্ধুদের সাধারণত বুদ্ধিসম্পন্ন স্ত্রী এবং শূদ্রদের সমকক্ষ বলে বিবেচনা করা হয়। শূদ্র এবং স্ত্রীদের বিবাহ সংস্কার ব্যতীত অন্য কোনও সংস্কার অনুষ্ঠান করতে হয় না।

অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা, অর্থাৎ স্ত্রী, শুদ্র এবং দ্বিজবন্ধুদের বেদের অর্থ হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষমতা নেই। তাদের জন্য মহাভারত রচনা করা হয়েছিল। মহাভারতের উদ্দেশ্য হচ্ছে বেদের তাৎপর্য বুঝিয়ে দেওয়া এবং তাই এই মহাভারতে বেদের সারস্বরূপ ভগবদ্গীতা গ্রথিত হয়েছে। অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা দর্শনের থেকে গল্প শুনতে বেশি ভালবাসে, এবং তাই শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতারূপে বৈদিক দর্শন দান করে গেছেন।

হরে কৃষ্ণ!

Advertisements