“শ্রীকৃষ্ণ যখন তাঁর লীলা সংবরণ করে ধর্ম ও তত্ত্বজ্ঞান সহ নিজ ধামে গমন করলেন, তখন সূর্যের মতো উজ্জ্বল এই ভাগবত পুরাণের উদয় হয়েছে। কলিযুগের অন্ধকারে আচ্ছন্ন ভগবৎ-দর্শনে অক্ষম মানুষেরা এই পুরাণ থেকে আলোক প্রাপ্ত হবে।” (শ্রীমদ্ভাগবত, ১.৩.৪৩)

Devananda-Pandit-12.jpg

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্য ধাম রয়েছে, সেখানে তিনি নিত্যকাল ধরে তাঁর নিত্য পার্ষদ এবং পরিকর সহ নিত্য আনন্দ উপভোগ করেন। তাঁর সেই নিত্য ধাম তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির প্রকাশ, কিন্তু এই জড় জগত হচ্ছে তাঁর বহিরঙ্গা শক্তির প্রকাশ। তিনি যখন এই জড় জগতে অবতরণ করেন, তখন তিনি তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তি সহ সমস্ত পরিকরদের নিয়ে স্বয়ং প্রকাশিত হন; তাকে বলা হয় আত্মমায়া। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান বলেছেন যে, তিনি তাঁর স্বীয় শক্তির (আত্মমায়া) দ্বারা প্রকট হন। তাই তাঁর রূপ, নাম, লীলা, পরিকর, ধাম ইত্যাদি জড় সৃষ্টি নয়। তিনি আসেন বদ্ধ জীবদের উদ্ধার করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপন করার জন্য।

ধর্ম হচ্ছে ভগবানের প্রণীত আইন। ভগবান ছাড়া কেউই ধর্ম-তত্ত্ব স্থাপন করতে পারেন না। তিনি অথবা তাঁর শক্তির দ্বারা আবিষ্ট উপযুক্ত প্রতিনিধিই কেবল ধর্মতত্ত্ব নির্দেশ করতে পারেন। প্রকৃত ধর্মের অর্থ হচ্ছে – ভগবানকে জানা, তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কথা জানা, তাঁর প্রতি আমাদের কর্তব্য সম্পর্কে জানা এবং এই জড় দেহ ত্যাগ করার পর আমরা যে চরমে কোথায় যাব সে সম্পর্কে জানা। জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ বদ্ধ জীবেরা এই মহান উদ্দেশ্য সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানে না। তাদের অধিকাংশই পশুর মতো আহার, নিদ্রা, ভয় ও মৈথুনে মগ্ন। তারা ধর্ম, জ্ঞান অথবা মুক্তির অযুহাতে ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির প্রচেষ্টায় ব্যস্ত। বিশেষ করে এই কলিযুগে তারা আরও বেশি অন্ধ হয়ে পড়েছে। এই কলিযুগের জনসাধারণ এক উন্নত স্তরের পশু ছাড়া আর কিছুই নয়। পারমার্থিক জ্ঞান অথবা ধর্মপরায়ণ জীবনের প্রতি তাদের কোন রকম স্পৃহা নেই। তারা এতই অন্ধ যে, তারা তাদের মন, বুদ্ধি অথবা অহংকারের ঊর্ধ্বে আর কিছুই দেখতে পায় না, কিন্তু তবুও তারা জ্ঞান, বিজ্ঞান এবং জাগতিক উন্নতির গর্বে অত্যন্ত গর্বিত। তাদের বর্তমান শরীর ত্যাগ করার পর তারা কুকুর অথবা শুকরের শরীর প্রাপ্ত হবে, কেননা মানব জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য থেকে তারা সম্পূর্ণভাবে ভ্রষ্ট হয়েছে।

কলিযুগ শুরু হওয়ার কিছু পূর্বে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, এবং ঠিক কলিযুগ শুরু হওয়ার প্রারম্ভে তিনি তাঁর নিত্য ধামে ফিরে গিয়েছিলেন। তিনি যখন এখানে বর্তমান ছিলেন, তখন তাঁর কার্যকলাপের মাধ্যমে তিনি সব কিছু প্রদর্শন করে গেছেন। তিনি বিশেষ করে ভগবদ্গীতার বাণী দান করে গেছেন এবং ধর্মের নামে যে সমস্ত প্রবঞ্চনা সমাজে চলছিল, সে সব তিনি নির্মূল করেছিলেন। আর এই জগৎ থেকে অপ্রকট হওয়ার পূর্বে তিনি শ্রীল নারদ মুনির মাধ্যমে শ্রীল ব্যাসদেবের মধ্যে শক্তি সঞ্চার করেছিলেন শ্রীমদ্ভাগবত প্রণয়ন করার জন্য। এভাবে ভগবদ্গীতা হচ্ছে এই কলিযুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষদের জন্য আলোকবাহী পথ-প্রদর্শকের মতো। অর্থাৎ, এই কলিযুগের মানুষ যদি জীবনের যথার্থ আলোক প্রাপ্ত হতে চায়, তাহলে কেবল এই দুটি গ্রন্থের শরণাপন্ন হতে হবে এবং তা হলেই তাদের জীবনের উদ্দেশ্য সফল হবে।

ভগবদ্গীতা হচ্ছে শ্রীমদ্ভাগবতের প্রাথমিক পাঠ। আর শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে জীবনের সার-সর্বস্ব সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণ। তাই আমাদের অবশ্যই শ্রীমদ্ভাগবতকে শ্রীকৃষ্ণের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি বলে গ্রহণ করতে হবে। যিনি শ্রীমদ্ভাগবতকে দর্শন করতে পারেন, তিনি শ্রীকৃষ্ণকেও সাক্ষাৎ দর্শন করতে পারেন; কেন না শ্রীমদ্ভাগবত এবং শ্রীকৃষ্ণ অভিন্ন।

Advertisements