ভগবানের শক্ত্যাবেশ অবতার বুদ্ধদেব অঞ্জনার পুত্ররূপে গয়া প্রদেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি অহিংসার বাণী প্রচার করেন এবং বেদ-বিহিত পশুবলিরও নিন্দা করেন। বুদ্ধদেব যখন আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন মানুষ অত্যন্ত নাস্তিক হয়ে গিয়েছিল। তারা মাংসাহার-প্রিয় এবং বৈদিক যজ্ঞের নামে সব জায়গাকেই কসাইখানাতে পরিণত করেছিল। তখন অবৈধভাবে অসংখ্য পশুবলি হচ্ছিল। নিরীহ পশুদের প্রতি সদয় হয়ে ভগবান তখন শ্রীবুদ্ধদেবরূপে অহিংসার বাণী প্রচার করেছিলেন। তিনি প্রচার করেছিলেন যে, তিনি বৈদিক নির্দেশ মানেন না এবং পশুহত্যার ফলে মনোবৃত্তি যে কিভাবে কলুষিত হয়ে যায়,  সে কথা তিনি মানুষদের বুঝিয়েছিলেন। ভগবত্তত্ত্বজ্ঞানরহিত কলিযুগের অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা তাঁর সেই তত্ত্ব অনুসরণ করেছিল এবং নীতিবোধ ও অহিংসা সম্বন্ধে শিক্ষালাভ করে ভগবৎ-উপলব্ধির পথে অগ্রসর হওয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করেছিল। তিনি এইভাবে ভগবত্তত্ত্বজ্ঞানবিহীন নাস্তিকদের বিমোহিত করেছিলেন। এই সমস্ত নাস্তিকেরা, যারা তাঁকে অনুসরণ করেছিল তারা ভগবানকে মানত না, কিন্তু তারা তাঁকে পূর্ণরূপে মেনেছিল এবং তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাযুক্ত হয়েছিল, যিনি নিজেই ছিলেন ভগবানের অবতার। এইভাবে বুদ্ধরূপে তিনি অবিশ্বাসী নাস্তিকদের আস্তিকে পরিণত করেছিলেন। সেটিই হচ্ছে বুদ্ধদেবের দয়া ঃ তিনি নাস্তিকদের আস্তিকে পরিণত করেছিলেন।

100538760

বুদ্ধদেবের আবির্ভাবের পূর্বে পশুবলিই ছিল সমাজের সবচাইতে লক্ষণীয় আচরণ। লোকেরা দাবি করত যে, বৈদিক নির্দেশ অনুসারে সেই সমস্ত পশু বলি হচ্ছে। আদর্শ পরম্পরার মাধ্যমে বৈদিক জ্ঞান লাভ না হলে বেদের অনিয়মিত পাঠক তার আলঙ্করিক ভাষার প্রভাবে বিপথগামী হয়। ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে যে, এই ধরনের তত্ত্বজ্ঞানবিহীন তথাকথিত পণ্ডিতেরা যারা তত্ত্বদ্রষ্টা গুরুর কাছ থেকে পরম্পরা ধারায় এই অপ্রাকৃত বাণী  গ্রহণ করতে চায় না, তারা অবশ্যই মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তাদের আচার-অনুষ্ঠানগুলির ঊর্ধ্বে বেদের মুখ্য তত্ত্ব সম্বন্ধে তারা সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞই থেকে যায়। ভগবদ্গীতায় (১৫/১৫) বলা হয়েছে, বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যঃ – সমস্ত বৈদিক পন্থা ধীরে ধীরে পরমেশ্বর ভগবানকে জানার পথে জীবকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবত্তত্ত্ব, জীবতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব প্রভৃতি সম্বন্ধে জানা এবং তাদের মধ্যে সম্বন্ধ নিরূপণ করা। যখন এই সম্বন্ধ সম্পর্কে জানা হয়, তখন সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠার শুরু হয় এবং তার ফলে অত্যন্ত সরল্ভাবে জীবনের পরম উদ্দেশ্য ভগবদ্ধামে ফিরে যাওয়ার পথ সুগম হয়। দুর্ভাগ্যবশত, বেদের অবৈধ পাঠকেরা কেবল বৈদিক সংস্কারগুলির দ্বারাই মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে  এবং তার ফলে তাদের স্বাভাবিক প্রগতি ব্যাহত হয়।

আসুরিকভাবাপন্ন এই ধরনের বিভ্রান্ত মানুষদের কাছে বুদ্ধদেব হচ্ছেন আস্তিকতার প্রতীক। তাই তিনি সর্প্রথমে তাদের পশুহত্যা করা থেকে বিরত করেন। ভগবৎ-চেতনা বিকাশের পথে পশুহত্যা হচ্ছে সবচাইতে ভয়ঙ্কর প্রতিবন্ধক। মহারাজ পরীক্ষিৎ বলেছেন যে, পশুঘাতীরা কখনও পরমেশ্বর ভগবানের দিব্য মহিমা আস্বাদন করতে পারে না। তাই মানুষকে যদি ভগবদ্ভক্তির পথে পরিচালিত করতে হয়, তাহলে সর্বপ্রথম তাদের পশুহত্যা থেকে বিরত করতে হবে। যারা বলে যে পশুহত্যার সঙ্গে পারমার্থিক প্রগতির কোন সম্বন্ধ নেই, তারা এক-একটি মূর্খ। এই ভয়ঙ্কর মতবাদের প্রভাবে কলির চেলা কয়েকজন তথাকথিত সন্ন্যাসী বেদের নাম করে পশুহত্যায় লিপ্ত হচ্ছে এবং অন্যদের সেই কাজে উদ্বুদ্ধ করছে। বেদে যে পশুবলির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার সঙ্গে কসাইখানায় অবিধিপূর্বক যে পশুহত্যা হচ্ছে তার পার্থক্য অনেক। অসুরেরা বা তথাকথিত বেদজ্ঞরা বেদে পশুবলির দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে, কিন্তু সেই পশুবলি যে প্রকৃতপক্ষে কি তা তাদের জানা নেই। তাই বুদ্ধদেব আপাতভাবে বেদকে অস্বীকার করেছিলেন। পশুহত্যাজনিত প্রচণ্ড পাপ থেকে মানুষকে উদ্ধার করার জন্য এবং যে সমস্ত মানুষ মুখে বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ব, শান্তি, সাম্য এবং স্বাধীনতার বাণী আউড়ে কাজের বেলায় নৃশংসভাবে নিরীহ পশুদের হত্যা করে, তাদের হাত থেকে পশুদের রক্ষা করার জন্য বুদ্ধদেব এই পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। যেখানে পশুহত্যা হয়, সেখানে ন্যায় নীতির কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না। বুদ্ধদেব সর্বতোভাবে এই পশুহত্যা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁর এই অহিংসার বাণী প্রচারিত হয়েছিল।

বুদ্ধদেবের দর্শনকে ব্যবহারিক পরিভাষায় ‘প্রচ্ছন্ন নাস্তিক্যবাদ’ বলে বর্ণনা করা হয়। কেননা এই মতবাদে পরমেশ্বর ভগবানকে স্বীকার করা হয়নি এবং বেদের প্রামাণিকত্ব স্বীকার করা হয়নি। কিন্তু আসলে তা হচ্ছে নাস্তিকদের বিমোহিত করে ভগবন্মুখী করার একটি ব্যবস্থা। বুদ্ধদেব হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবানের অবতার। প্রকৃতপক্ষে তিনিই হচ্ছেন বৈদিক জ্ঞানের আদি প্রবর্তক। তাই তিনি বৈদিক তত্ত্বদর্শন কখনই অস্বীকার করতে পারেন  না। বাহ্যিকভাবে তিনি তা অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু ‘সুর-দ্বিষ’ বা অসুরদের জন্য, যারা সবসময় ভগবদ্বিদ্বেষী এবং যারা বেদের অজুহাত দেখিয়ে গোহত্যা অথবা পশুহত্যা সমর্থন করতে চায়, তাদের জন্য সেই জঘন্য কার্যকলাপ রোধ করার জন্য বুদ্ধদেবকে সর্বতোভাবে বেদের প্রামাণিকতা অস্বীকার করতে হয়েছিল। তাঁর কার্য-সিদ্ধির জন্য কেবল তিনি এটি করেছিলেন। তা না হলে তাঁকে ভগবানের অবতার বলে স্বীকার করা হত না, তা না হলে জয়দেব আদি বৈষ্ণব আচার্যরা তাঁর অপ্রাকৃত মহিমা কীর্তন করতেন না। বুদ্ধদেব বেদের প্রারম্ভিক সিদ্ধান্ত তৎকালীন জনসাধারণের উপযোগী করে প্রচার করেছিলেন বেদের যথার্থ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এইভাবে তিনি ভগবৎ-চেতনা বিকাশের পথে মানুষকে পরিচালিত করেছিলেন। (শ্রীমদ্ভাগবত, ১.৩.২৪, তাৎপর্য)

Advertisements