ভবসিন্ধু তরার সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা বা উপায় হচ্ছে সাধুসঙ্গ। এই জড় জগতটি হচ্ছে ‘দুঃখালয়ম-অশাশ্বতম’। এটি শাশ্বত নয়। এটি অনিত্য এবং দুঃখপূর্ণ। দুঃখ-কষ্টের সমাহার এই জড় জগতের জীব এটির অনিত্যতা বা ক্ষণস্থায়ী স্থিতির কথা হৃদয়ঙ্গম করতে না পারলে কিংবা জড়া-প্রকৃতির কঠোর আঘাতের শিকার না হলে সে ভগবদ্-রাজ্য বা ভক্তিপথের প্রতি আসক্ত হয় না কিংবা তা’র প্রতি আকর্ষণও তার জাত হয় না। যখন সে সংসার সমুদ্রে ক্রমাগতভাবে সুখ অন্বেষণে ব্যর্থ হয়, তখন সে সৎসঙ্গ-রুপক নৌকার সাহায্যে জীবন রক্ষা করতে চেষ্টিত হয়ে থাকে। সেই সময় সে সাধুসঙ্গের আবশ্যকতায় লড়ে থাকে। সাধুসঙ্গের প্রভাবে জীবের মলিন চিত্ত হতে সমস্ত মলিনতা দূর হয়ে তার চিত্ত বিশুদ্ধ হয়ে যায়। মানুষ সর্বদাই সুখের পিছনে ধাবমান। কিন্তু এই জড় জগতে সুখের আশা করা মরুভূমিতে জল অন্বেষণের মতো বিফল হয়। তাই প্রকৃত সুখ লাভের ইচ্ছা থাকলে ভগবৎ পথ বা ভক্তিপথে একান্তভাবে প্রবেশ করতে হবে; ভগবদ্ চরণারবিন্দে আশ্রিত হতে হবে; কারণ “সকল সম্পদময় কৃষ্ণের চরণ”। যাঁরা ভগবানের পাদপদ্মে আশ্রিত, তাঁরা সর্বদাই দিব্যসুখ আস্বাদন করেন। পক্ষান্তরে বলা যেতে পারে যে, ভক্ত বা সাধু প্রকৃতপক্ষে দিব্য সুখই আস্বাদন করে থাকেন। কিন্তু ভগবদ্ বহির্মুখ বিষয়ীলোক সর্বদাই দুঃখই পেয়ে থাকে। তাই সেই সংসার ক্লেশের উপলব্ধিই হচ্ছে সাধুসঙ্গের কারণ।

scan92a


তাই সাধুসঙ্গেই কেবল প্রকৃত সুখ মিলে থাকে। সাধুসঙ্গের দ্বারা জীবের হৃদয়ে ভক্তির উদ্রেক হয়। ভক্তিই সুখ লাভের উপায়। তাই ভক্তি ব্যতীত এই সংসার সাগর থেকে উদ্ধারের উপায় নেই। সংসার-দাবানলে দগ্ধ মানুষের মন একমাত্র সাধুর সংসর্গেই বিমল ছায়া লাভ করতে সমর্থ হয়। এ প্রসঙ্গে শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে,-

“বহিরঙ্গা শক্তির প্রভাবে কৃষ্ণ-বহির্মুখ, অধর্মপরায়ণ, অত্যন্ত দুঃখদুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের অনুগ্রহ করার জন্য পরোপকারী মহান্ত সাধু, গুরু, বৈষ্ণবগণ ভগবানের প্রতিনিধিরূপে এ ধরাধামে বিচরণ করে থাকেন।” (শ্রীমদ্ভাগবত, ৩/৫/৩)

এইরকম সাধুদের সঙ্গ দ্বারা জীবের সংসার বন্ধন ক্ষয় হয়ে ভগবদ্ভক্তি জাগ্রত হয়ে থাকে।

“সাধুসঙ্গে কৃষ্ণভক্ত্যে শ্রদ্ধা যদি হয়।
ভক্তিফল ‘প্রেম’ হয়, সংসার যার ক্ষয়।।” (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ২২/৪৯)

ভগবানের লীলা ভগবদ্ভক্তের মুখ থেকে শ্রবণ করলে ত্রিতাপদগ্ধ হৃদয়ে যেমন শান্তি লাভ হয়, সেরকম অন্য কোন স্থান হতে লব্ধ হয় না। সাধু বা ভগবদ্ভক্তের সঙ্গলাভের দ্বারা জীবের আত্যন্তিক শ্রেয় লাভের সূচনা দিয়ে শাস্ত্রে বলা হয়েছে, –
“‘সাধুসঙ্গ’, ‘সাধুসঙ্গ’ – সর্বশাস্ত্রে কয়।
লবমাত্র সাধুসঙ্গে সর্বসিদ্ধি হয়।।” (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ২২/৫৪)

এক মুহূর্তের জন্য সাধুসঙ্গে সর্বসিদ্ধি হয়ে থাকে। তাই সমস্ত সিদ্ধির মধ্যে সর্বোচ্চ সাধ্যবস্তু কৃষ্ণপ্রেমই একমাত্র সাধুসঙ্গের দ্বারা লাভ হয়ে থাকে।

“কৃষ্ণভক্তি-জন্মমূল হয় ‘সাধুসঙ্গ’।
কৃষ্ণপ্রেম জন্মে, তেঁহো পুণঃ মুখ্য অঙ্গ।।” (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য, ২২/৮৩)
অর্থাৎ, কৃষ্ণপ্রেমের উদ্রেকের জন্য সাধুসঙ্গ অপরিহার্য। সাধুদের সঙ্গ দ্বারা পতিত জীবগণের পরম শ্রেয় প্রাপ্তি ভগবদপ্রেমই লাভ হয়ে থাকে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তিযোগে সেবার মূল কারণ হচ্ছে সাধুসঙ্গ।
হরিবোল!

Advertisements