গোপালতাপনী উপনিষদের বর্ণনানুযায়ী একসময় ব্রজবাসী গোপীগণ শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করে বললেন, “হে প্রাণবল্লভ! আমরা কিভাবে সর্বদা তোমাকে আনন্দ দিতে পারব, তোমাকে সুখ দিতে পারব?”

blog-k-playing-flute-for-gopis-jpg

তদুত্তরে শ্রীকৃষ্ণ গোপীদেরকে বললেন, “গোপীগণ! তোমরা যমুনার অপর পাড়ে যেখানে মুনিপ্রবর দুর্বাসা আছেন সেখানে যাও। (বিঃ দ্রঃ – এ দুর্বাসা কিন্তু মহারাজ অম্বরীষের শ্রীচরণে অপরাধকারী দুর্বাসা নন, ইনি শ্রীকৃষ্ণের অতি প্রিয় ভক্ত অন্য এক দুর্বাসা।) তাঁকে ভক্ষ্য দ্রব্য প্রদান করে তাঁর সন্তোষ বিধান কর এবং তিনি তোমাদের প্রতি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে আশীর্বাদ করলে তোমাদের এই মনস্কামনা পূর্ণ হবে। তখন তোমরা আমাকে আনন্দ দিতে পারবে, আমাকে সুখ দিতে পারবে।”

ব্রজবাসীরা পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ব্রজেশ্বর! যমুনার অগাধ জল, উপরন্তু প্রবল বেগে স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে, কিভাবে তা পার হয়ে আমরা তাঁর কাছে যাব? মুনিবরের কাছে না গেলে তো আমাদের শ্রেয়লাভ হবে না।”

8b04f1ee3c1eb8991a427d55668a50dc.jpg

তখন শ্রীকৃষ্ণ বললেন, “হে গোপীগণ! আমি তোমাদের একটি অতি গোপনীয় মন্ত্র প্রদান করছি, তোমরা ‘শ্রীকৃষ্ণ নিত্য ব্রহ্মচারী’ এই মন্ত্র উচ্চারণ পূর্বক যমুনার জলমধ্যে প্রবেশমাত্রই যমুনা তোমাদেরকে পথ করে দেবেন।”

কেউ একথা বুঝতে পারবেন না যে শ্রীকৃষ্ণ কিভাবে নিত্য ব্রহ্মচারী। দ্বারকায় তাঁর ১৬ হাজার ১শ’ ৮ জন মহিষী আছেন এবং তাঁদের থেকে তিনি বহু পুত্র-সন্তানাদি উৎপাদন করেছেন। তিনি একজন বিরাট গৃহস্থ, তাঁকে কিভাবে ব্রহ্মচারী বলা যেতে পারে? তিনি মধ্যরাত্রে বৃন্দাবনের অরণ্যে শত শত গোপীদের সঙ্গে রাসনৃত্য করেছেন, তাঁকে কিরূপে ব্রহ্মচারী বলা সঙ্গত হতে পারে? গোপীগণও যখন ঠিক অনুরূপভাবে মনে মনে চিন্তা করছিলেন, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের মনের অভিপ্রায় বুঝতে পেরে তাঁদেরকে বললেন, “গোপীগণ! আমার নামের এমনই মাহাত্ম্য যে, নাম স্মরণমাত্র অতলস্পর্শা নদীও অল্পতোয়া হয়।”

গোপীগণ শ্রীকৃষ্ণের কথায় বিশ্বাস স্থাপনপূর্বক তখনই ‘শ্রীকৃষ্ণ নিত্য ব্রহ্মচারী’ মন্ত্র উচ্চারণ করে যমুনার জলে নামলেন। সঙ্গে সঙ্গে যমুনা ক্ষীণতোয়া হলে তা অতিক্রম করে দুর্বাসা মুনির আশ্রমে গিয়ে তাঁকে ভক্তিভরে প্রণাম পূর্বক জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মুনিপ্রবর! আমরা কিভাবে আপনাকে প্রসন্ন বিধান করতে পারি? আপনি কৃপা করে আমাদেরকে আশীর্বাদ করুন আমাদের যাতে কৃষ্ণভক্তি লাভ হয়, আমরা যাতে শ্রীকৃষ্ণকে সতত সুখ ও আনন্দ দিতে পারি।”

তারপর তাঁরা তাঁদের পায়সান্ন ও অতিপ্রিয় ঘৃতপক্বান্ন মুনিবরকে ভোজন করালেন। মুনিপ্রবর দুর্বাসা গোপীদের প্রতি স্নেহবশতঃ সুমিষ্ট পায়সাদি ভোজন করে অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে গোপীদেরকে আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমাদের শুদ্ধ কৃষ্ণভক্তি লাভ হোক, তোমরা সতত শ্রীকৃষ্ণকে সুখ ও আনন্দ দিতে পারবে। এখন তোমরা ব্রজে গমন কর।”

গোপীগণ যমুনায় পুনরায় পূর্বের মতো অগাধ জল ও প্রবল স্রোত প্রবাহিত হতে দেখে দুর্বাসাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে মুনিবর! আমরা কিভাবে অগাধ জলপূর্ণা স্রোতস্বতী যমুনা পার হব?” তদুত্তরে মুনি বললেন যে, “নিরাহারী আমাকে স্মরণ করলেই যমুনা তোমাদেরকে পথ দিয়ে দেবেন। অর্থাৎ ‘দুর্বাসা নিত্য নিরাহারী’ এই গোপনীয় মন্ত্র উচ্চারণ-পূর্বক যমুনা জলমধ্যে প্রবেশমাত্রই এই যমুনা তোমাদেরকে পথ করে দেবেন।”

তখন গোপীগণ পরস্পরের মধ্যে নিম্নস্বরে পরস্পরকে বলতে লাগলেন, “মুনিবর আমাদেরকে প্রদত্ত প্রচুর পরিমাণে পায়সান্ন ও ঘৃতান্ন ভোজন করে তিনি কি প্রকারে নিরাহারী হলেন? তিনি কি কিছুই ভোজন করেননি? এ আবার কি কথা?”

আমরা এ কথা কিছু বুঝতে পারব কি? ‘শ্রীকৃষ্ণ নিত্য ব্রহ্মচারী আর দুর্বাসা নিত্য নিরাহারী’। গোপালতাপনী উপনিষদে এ কথা বর্ণিত হয়েছে। এটি বোঝা এত সহজ কথা নয়। এটিতে এতো গভীর তত্ত্ব নিহিত আছে যা কেউ চিন্তা করতে পারবে না। এটি একটি অচিন্ত্য তত্ত্ব।

হরিবোল!

Advertisements