13124945_179597875767894_7344972812168448436_n

  • বৈদিক জ্ঞানের পরম উদ্দেশ্য
  • যজ্ঞ সম্পাদনের উদ্দেশ্য
  • যোগের উদ্দেশ্য
  • সমস্ত তপশ্চর্যার উদ্দেশ্য
  • জীবনের পরম উদ্দেশ্য

বৈদিক শাস্ত্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হওয়া এবং চরমে তাঁর প্রতি প্রেমময়ী সেবাপরায়ণ হওয়া। এইটিই হচ্ছে সমস্ত বেদের মূল তত্ত্ব। শ্রীমদ্ভগবদগীতায় সেই সত্যকে প্রতিপন্ন করে ভগবান বলেছেনঃ সমস্ত বেদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁকে জানা। সমস্ত শাস্ত্র তিনি রচনা করেছেন তাঁর অবতার শ্রীল ব্যাসদেবের মাধ্যমে, যাতে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ অধঃপতিত জীবেরা তাঁকে (শ্রীকৃষ্ণকে) জানতে পারে। কোন দেবতাই জড় জগতের বন্ধন থেকে জীবকে মুক্তি দিতে পারেন না। সেই কথা সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে ঘোষিত হয়েছে। ভগবত্তত্ত্ব সম্বন্ধে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞ নির্বিশেষবাদীরা ভগবানের সর্বশক্তিমত্তাকে খর্ব করে তাঁকে জীবেদের সমপর্যায়ভুক্ত করে, এবং সেই জন্য বহু সাধ্যসাধনা করেও নির্বিশেষবাদীরা জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারে না। বহু বহু জন্মের পর পারমার্থিক জ্ঞান লাভ করে তারা পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত হতে পারে।

সমস্ত যজ্ঞের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাসুদেবকে তত্ত্বত জানা। বাসুদেবের আরেক নাম হচ্ছে যজ্ঞ, এবং ভগবদগীতায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সমস্ত যজ্ঞ এবং সমস্ত কর্মসমূহ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য সাধিত হওয়া উচিত। যোগের উদ্দেশ্যও তাই; ‘যোগ’ কথাটির উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমেশ্বর ভগানের সংস্পর্শে আসা। এই প্রক্রিয়ায় অবশ্য আসন, প্রাণায়াম, ধ্যান, ধারণা ইত্যাদি কতকগুলি অঙ্গ রয়েছে, এবং সে সবেরই উদ্দেশ্য হচ্ছে বাসুদেবের প্রকাশ পরমাত্মায় চিত্তকে একাগ্র করা। পরমাত্মা-উপলব্ধি হচ্ছে আংশিকভাবে বাসুদেব উপলব্ধি, এবং যখন কেউ সেই প্রচেষ্টায় সিদ্ধি লাভ করেন, তখন তিনি পূর্ণরূপে বাসুদেবকে জানতে পারেন।

জ্ঞান আহরণের আঠারোটি অঙ্গ রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় জ্ঞান আহরণ করার ফলে মানুষ ধীরে ধীরে অমানী, অদাম্ভিক, অহিংস, ক্ষান্ত, সরল, সদগুরুর অনুগত এবং আত্মসংযমী হন। যে জ্ঞান মানুষকে পারমার্থিক স্তরে উন্নীত করে বাসুদেবের দর্শন লাভ করায়, তাই হচ্ছে যথার্থ জ্ঞান। তাই, বাসুদেব হচ্ছেন সমস্ত জ্ঞানের চরম উদ্দেশ্য। জড়জাগতিক জ্ঞানের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইন্দ্রিয়সুখভোগ, যার অর্থ হচ্ছে জড় অস্তিত্ব বৃদ্ধি, অর্থাৎ ত্রিতাপ দুঃখ বৃদ্ধি। কিন্তু সেই জ্ঞান যখন পারমার্থিক জ্ঞানের পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করে, তখন দুঃখ-দুর্দশাপূর্ণ জীবনের সমাপ্তি হয় এবং বাসুদেব স্তরে পারমার্থিক জীবনের শুরু হয়।

সব রকমের তপস্যারও এই একই উদ্দেশ্য। ‘তপস্যা’ কথাটির অর্থ হচ্ছে কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য স্বেচ্ছাকৃতভবে দৈহিক কষ্ট স্বীকার করা। রাবণ এবং হিরণ্যকশিপু জড় বিষয়ভোগের উদ্দেশ্যে কঠোর তপস্যা করেছিল। আধুনিক যুগের রাজনীতিবিদদেরও মাঝে মাঝে কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কঠোর তপস্যা করতে দেখা যায়। কিন্তু এগুলি যথার্থ তপস্যা নয়। তপস্যা কেবল বাসুদেবকে জানার উদ্দেশ্যেই সাধন করা উচিত। বাসুদেবকে জানার জন্য যখন দৈহিক কষ্ট বা অসুবিধা স্বীকার করা হয় সেটি হচ্ছে যথার্থ তপস্যা। এছাড়া অন্য সব রকমের তপস্যাই রজ ও তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত। রজ এবং তমোগুণ জীবের দুঃখ-দুর্দশার নিবৃত্তি করতে পারে না। সত্ত্বগুণই কেবল ত্রিতাপ দুঃখ নিবৃত্তি করতে পারে; শ্রীকৃষ্ণের পিতা-মাতা বসুদেব এবং দেবকী তাঁকে তাঁদের সন্তানরূপে পাওয়ার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। বসুদেব এবং দেবকীর কঠোর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের সন্তানরূপে আবির্ভূত হতে সম্মত হন। তাই যদি তপস্যা করতে হয়, তবে তা যেন অবশ্যই জ্ঞানের পরম লক্ষ্য বাসুদেবকে জানবার জন্য সাধিত হয়।

ভগবদগীতায় বলা হয়েছে যে, মহাত্মা হচ্ছেন তাঁরা, যাঁদের মনোবৃত্তি অত্যন্ত প্রশস্ত এবং তার ফলে যাঁরা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যুক্ত হয়েছেন। তাঁরা ভগবানের অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা প্রভাবিত। তাই এই মহৎ আশয়সম্পন্ন পুরুষেরা নিরন্তর অনন্য ভক্তি সহকারে পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় যুক্ত। এইটিই জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত এবং সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রে সে নির্দেশই দেওয়া হয়েছে।

Advertisements